Analyst Forum

বুক বিল্ডিং পদ্ধতি কি?

Posted By : iftekhar    May 04, 2019   

image not available

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কিভাবে আইপিও’তে আসা কোম্পানির শেয়ার মূল্য নির্ধারিত হয়?

বর্তমানে আইপিও শেয়ারের মূল্য ফেস ভ্যালু’র সমান চাওয়া হয় অথবা বেশি চাওয়া হয়। বেশি চাওয়া হলে তাকে প্রিমিয়াম বলে কম চাওয়া হলে ডিসকাউন্ট বলে। আমাদের শেয়ার বাজারে আজ পর্যন্ত ডিসকাউন্ট মূল্যে কোন অনুমোদন দেওয়া হয়নি। সাধারণত মোট নীট এসেটস্কে মোট শেয়ার সংখ্যা দিয়ে ভাগ করে প্রতি শেয়ারের এসেটস্ মূল্য বের করা হয়। অথবা কোম্পানির অতীত শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস)’কে একটি নির্দিষ্ট আয়ের হার ধরে মূল্য নির্ধারণ করা হয়। উদাহরণ স্বরূপ ধরুন, একটি কোম্পানির মোট নীট সম্পদ ১০০,০০০ (এক লক্ষ) টাকা। এর শেয়ার সংখ্যা ১ হাজারটি। বিগত বৎসরের শেয়ার প্রতি আয় ২০ টাকা। এই অবস্থায় শেয়ারে আইপিও মূল্য কত হতে পারে? আমরা যদি ধরে নেই ঝুঁকিহীন বিনিয়োগের উপর আয় করা যাবে শতকরা ১০ টাকা হারে। তাহলে ২০ টাকা আয় করতে কত মূল্য দেওয়া যাবে? শেয়ার প্রতি নীট সম্পদ হিসাবে শেয়ারের মুল্য হবে ১০০ টাকা (১০০,০০০/১০০০)। আর যদি গড় আয় হিসাবে ধরা হয় তা হবে ২০০ টাকা (১০০/১০ ী ২০)। এই ক্ষেত্রে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ ১০০ টাকা অনুমোদন দিতে পারে। আইপিও কোম্পানি বেশি (প্রিমিয়াম) চাইলে ২০০ টাকা পর্যন্ত দিতে পারে। কিন্তু ২০০ টাকা দিতে হলে সম্পদের গুণাগুণ, মূল্য ও পূর্বেকার আয়ের হারের ভবিষ্যৎ সম্ভাব্যতা নির্নয় করা প্রয়োজন। ভিন্ন ভিন্ন বিশেষজ্ঞ ভিন্ন ভিন্ন মূল্য প্রস্তাব করতে পারেন। আইপিও ইস্যু রুল মোতাবেক প্রিমিয়ামে শেয়ার আইপিওতে আসতে হলে ক্রেডিট রেটিং করাতে হবে। এই ফিক্সড প্রিমিয়াম মূল্য সাধারণত আইপিও কোম্পানির চাহিদা থেকে কমে নির্ধরিত হয় বা হতে পারে । তাই মূল্য নির্ধারণ বাজারের উপর ছেড়ে দেওয়ার একটি পদ্ধতি আছে। পুঁজিবাজারের পরিভাষায় একে বুক বিল্ডিং বলে। এটা কিভাবে হয়ে থাকে ? উপরে উদাহরণটিকে নিয়ে বুক বিল্ডিং দেখানো যেতে পারে। কোম্পানি ১০০০ শেয়ার যার প্রতিটির ফেস ভ্যালু ১০০ টাকা এবং ইনডিকেটিভ মূল্য ১৪০ টাকা নির্ধারণ করে বাজার থেকে কোটেশন আহবান করা হলে নিম্নোক্ত কোটেশন পাওয়া গেলে আইপিও মূল্য হবে ১৫০ টাকা।

সম্ভাব্য ক্রেতা  তারিখ পরিমান যে মুল্যে ক্রয় করতে চান

অ      ২০.০১.১০ ২০০ টি     ১৬৮.০০

ই      ২১.০১.১০ ৩০০ টি     ১৫০.০০

ঈ      ২২.০১.১০ ৪০০ টি     ১৬৫.০০

উ      ২৩.০১.১০ ১০০ টি     ১৫০.০০

ঊ      ২৪.০১.১০ ৪০০ টি     ১৩২.০০

ঋ      ২৫.০১.১০ ৬০০ টি     ১৩০.০০

                     মোট =২০০০ টি

এমতাবস্থায় মোট অফার পাওয়া গেল ২০০০ শেয়ারের জন্য। সর্বোচ্চ মুল্য ১৬৮ টাকা সর্বনিম্ন মূল্য ১৩০ টাকা। ১৫০ টাকায় ১০০০ টি শেয়ার শেষ হয়ে যাওয়ায় আইপিওতে প্রতি শেয়ার ১৫০ টাকা ধরে দেওয়া হবে। অতিরিক্ত ১০০০ শেয়ারের মূল্য বিবেচনায় আনা হবে না। 

বাংলাদেশের বাজারে বুক বিল্ডিং পদ্ধতির ইতিহাস দীর্ঘ দিনের নয়। ২০১০ সালের প্রথম দিকে বুক বিল্ডিং পদ্ধতি বাজারে আসে। যে উদ্দেশ্যে বুক বিল্ডিং পদ্ধতি চালু করা হয় তাহা অর্জিত না হওয়ায় দীর্ঘ দিন বুক বিল্ডিং পদ্ধতি বন্ধ রাখা হয়। ইস্যু রুল-২০১৫ প্রবর্তিত নতুন নিয়মে আসা কোম্পানিগুলো হলোঃ-

১)     দি একমি লেবরেটোরিজ লিমিটেড। (তালিকাভূক্ত হয়েছে)

২)     এসটিএস হোল্ডিংস লিমিটেড (এ্যাপোলো হাসপাতাল) তালিকাভূক্ত হয়নি।

৩)     আমরা নেটওয়ার্কস। তালিকাভূক্ত হয়েছে।

৪)     ঢাকা রিজেন্সি হোটেল এন্ড রিসোট লিমিটেড। তালিকাভূক্ত হয়নি।

৫)     বসুন্ধরা পেপার মিলস। প্রক্রিয়ধীন আছে।

৬)     আমান কটন ফাইবারস। প্রক্রিয়ধীন আছে।

৭)     ডেল্টা হসপিটাল। তালিকাভূক্ত হয়নি।

৮)     বেঙ্গল পলি। তালিকাভূক্ত হয়নি।

৯)     ইনডেক্স এ্যাগ্রো। তালিকাভূক্ত হয়নি।

১০)    রানার অটোমোবাইল। তালিকাভূক্ত হয়নি।

১১)    পপুলার ফার্মাসিটিক্যালস লিঃ। তালিকাভূক্ত হয়নি।

১২)    স্কয়ার নিট কম্পোজিট। তালিকাভূক্ত হয়নি।

১৩)    সামসুল আলামিন রিয়েল এস্টেট। তালিকাভূক্ত হয়নি।

এই সকল ক্ষেত্রে ও অস্বচ্চতার অভিযোগ আসে। বিএসইসি এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছেন। আসা করা যায় এতে ভালো সুফল পাওয়া যাবে। প্রথম প্রচলিত নিয়ম অনুসারে বিভিন্ন শ্রেনীর ৫টি প্রতিষ্ঠানের বীট প্রাইসের মাধ্যমে প্রিমিয়াম প্রাইস নির্ধারিত হতো। বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক বীটারদের সংখ্যা তুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাট অফ প্রাইস নির্ধারনের পূর্বেকার নিয়ম চালু রাখার কারণে পরস্পর যোগসাজসের মাধ্যমে অযৌক্তিক প্রিমিয়াম নির্ধারিত হতে দেখা গেছে। প্রস্তাবিত নিয়ম অনুসারে সকল বীটারদের দেওয়া দরের গড় অনুসারে শেয়ারের আইপিও মূল্য নির্ধারণ করলে ভালো হবে বলে অনেকে মনে করেন। আসা করা যায় এর ফলে যৌক্তিক প্রিমিয়াম প্রাইস নির্ধারন করা সহজ হবে। স্থিতিশীল পুঁজিবাজারের জন্য সাধরণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখার জন্য  ফিক্সড প্রাইস ও বুক বিল্ডিং এই উভয়ের পদ্ধতিতে আরো সংস্কারের প্রয়োজন। তাহলে নামিদামী কোম্পানী পুঁজি বাজারে আসবে। এর ফলে বাজারের গভীরতা বাড়বে।   

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কারা বিড করতে পারবেন?

ইস্যু রুল-২০১৫ অলোকে বলা যায় যে কেবলমাত্র ইলিজেবল ইনভেষ্টর (ইআই) বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীগণ বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে বিড করতে পারবেন। ইস্যু রুল্স ২০১৫ অনুযায়ী ঊষরমরনষব (ঊও) বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হলো ঃ

১.   মার্চেন্ট ব্যাংক ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার।

২.   এসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি।

৩.   মিউচ্যুয়াল ফান্ড।

৪.   ষ্টক ডিলার।

৫.   ব্যাংক।

৬.   ফিনানসিয়াল ইনিসটিটিউশন।

৭.   ইনস্যুরেন্স কোম্পানী।

৮.   অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড ম্যানেজার।

৯.   অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড।

১০.  কমিশন নিবন্ধিত কোন সিকিউরিটিজ কাস্টোডিয়ানের মাধ্যমে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে পোর্টফোলিওতে বিনিযয়োগ করা বিদেশী বিনিয়োগকারী।

১১.  রিকোগনাইজড পেনশন ফান্ড এবং পিএফ ফান্ড।

১২.  কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সমূহ।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কি দামে জনগণকে আইপিওর বরাদ্দের আবেদন করতে হবে?

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ইলিজেবল ইনভেষ্টর (ইআই) বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীগণকে অন লাইনে বিড করার জন্য ৭২ ঘন্টা সময় দেওয়া হয়। উক্ত সময়ের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীগণ নিজ নিজ বিবেচনায় শেয়ারের দাম  প্রস্তাব করেন। ৭২ ঘন্টার মধ্যে উক্ত শেয়ারের (Cut-off Price) কাট-অফ প্রাইস নির্ধারণ হয়। কাট-অফ প্রাইসের নির্ধারিত দাম থেকে ১০% কমে জনগণকে আইপিওর আবেদন করতে হয়। কোন শেয়ারের Cut-off Price ৫০ টাকায় নির্ধারণ হলে ৪৫ টাকায় আইপিও বরাদ্ধ হবে।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আইপিও প্রাইসিং চালু হলে ইস্যুয়ার, বিনিয়োগকারীগণ এবং পুঁজিবাজারের মধ্যে কারা কিভাবে লাভবান হবেন?

বুক বিল্ডিং পদ্ধতি আমাদের দেশের জন্য নতুন হলেও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বেশ কয়েকবছর ধরে এটা চালু আছে। কোনো কোম্পানি যখন বাজারে শেয়ার ছাড়তে চায়, অনেক বিষয়ের মধ্যে একটি বড় বিষয় হলো শেয়ারের মূল্য কত হওয়া উচিত। হিসাববিজ্ঞানের বইতে শেয়ারের মূল্য নির্ণয় করার যে সকল পরীক্ষিত নিয়ম আছে সেগুলো মেনেও যদি শেয়ার মূল্যায়ন করা হয়, তারপরও দেখা যায় বাজার ব্যবস্থায় প্রাইসিং যে ঠিক হয়নি তা বলে দেয়। অর্থাৎ অনেক বিনিয়োগকারী  বাজারগতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করেন। গ্রামীণের ক্ষেত্রে ১০ টাকার শেয়ারে ৭০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করেও বাজারের সঙ্গে সমন্বয় ঘটাতে পারেনি। কোম্পানি ৬০ টাকা প্রিমিয়াম পেয়েছে। আর যারা আইপিও পেয়েছে এবং প্রথম দিন বিক্রয় করেছে তারা ৭০ টাকার শেয়ার ২০০ টাকায় বিক্রি করেছে। এর অর্থ কি দাঁড়ায়? যারা পুঁজিবাজারে টাকা খাটায় ও যাদের উপর পুঁজিবাজার দাঁড়িয়ে আছে তারা ১০ টাকার শেয়ার ২০০ টাকায় ক্রয় করতে আগ্রহী। আইপিও শেয়ারের দর নির্ধারণে ভুল হওয়ার কারণে বাজারে আইপিও ব্যবসায়ীর সৃষ্টি হয়েছে বলে বাজার বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। অতিরিক্ত প্রিমিয়াম-এর টাকা যদি কোম্পানির কাছে যেতো তাহলে পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে কোম্পানির আয় বাড়তো, ভালো ডিভিডেন্ড দেওয়া সম্ভব হতো। আইপিও ব্যবসায়ীদের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে এবং এই বাড়ার হার অস্বাভাবিক। আশা করা যায় বুক বিল্ডিং পদ্ধতি সঠিকভাবে চালু হলে সবচেয়ে বেশি উপকার হবে কোম্পানির এবং ক্ষতি হবে কথিত আইপিও ব্যবসায়ীদের। আইপিও ব্যবসায়ীগণ এক আইপিও থেকে লাভ নিয়ে আবার আর এক আইপিওতে বাড়তি চাহিদা সৃষ্টি করে। এইভাবে একটি দুষ্টচক্র সৃষ্টি হয়েছে বলে বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতেও আঁতাত হতে পারে। সেদিকে দৃষ্টি না দিলে কাক্সিক্ষত সুফল হাত ছাড়া হয়ে যেতে পারে। কাদের দিয়ে ইনডিকেটিভ মূল্য নির্ধারিত হয়েছে এবং তাদেরকে কিভাবে বাছাই করা হয়েছে সেটার উপর সাফল্য নির্ভর  করবে।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতি সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারলে প্রতিষ্ঠিত বড় বড় কোম্পানি তাদের শেয়ারবাজারে আনতে উৎসাহিত হবে। তাই যদি হয় বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ার প্রাইসিং হলে ইস্যুয়ার (আইপিও এবং ডাইরেক্ট লিস্টিং), বিনিয়োগকারী ও পুঁজিবাজার সকলের জন্য উইন অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে।

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, এফসিএমএ

প্রাক্তন সভাপতি(১৯৯৫)আইসিএমএবি

ব্যবস্থাপনা পরিচালক,

আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেড।

ঢাকা স্টক একচেঞ্জ ট্রেক নং-১০৬,

চট্টগ্রাম স্টক একচেঞ্জ ট্রেক নং-০০৫,

লেখক: শেয়ার বাজার জিজ্ঞাসা

֩ Comments (0)

No comments, be the first who add

Administrator

Close Name:

Password:

Add Comment

Close       
     
-
-


B I U URL    :) :( :P :D :S :O :=) :|H :X :-*

Add this verification code:   cd666



Analyst Forum